যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিয়ন্ত্রক জটিলতার মুখে বিকল্প আয়ের উৎসের খোঁজে থাকা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে অস্ট্রেলিয়ার রিয়েল এস্টেট খাত। স্থিতিশীল অর্থনীতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি এসব মিলিয়ে দেশটি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ গন্তব্য হয়ে উঠেছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
অস্ট্রেলিয়ার রিয়েল এস্টেট খাতে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাগা জানিয়েছে, হংকং, সিঙ্গাপুর ও জাপানের মতো দেশ থেকে বিনিয়োগকারীরা অস্ট্রেলিয়ার আবাসন খাতে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত জাগা বর্তমানে প্রায় ১০০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার বা ৬৬ কোটি ডলারের সমতুল্য সম্পদ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আবাসন ও বাণিজ্যিক সম্পদ উন্নয়নে যুক্ত সংস্থার সংযোগ ঘটায়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২৫ শতাংশ বিনিয়োগকারী বিদেশী। জাগা জানিয়েছে, আরো কিছু চুক্তি সফল হলে জাপান প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বাজার হয়ে উঠতে পারে।
জাগার প্রধান নির্বাহী (সিইও) অ্যালান গ্রিনস্টেইন জানান, অনেক বিনিয়োগকারী এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। শুধু সাধারণ ঝুঁকিই নয়, বরং সেখানে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত বিনিয়োগের ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে সবাই এখন বিকল্প বাজার খুঁজছেন।
অস্ট্রেলিয়ায় জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, এর বিপরীতে আবাসন সংকট তীব্র হচ্ছে। সরকারের পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ, যা আগামী দশকের মাঝামাঝি নাগাদ ৩ কোটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। অভিবাসনের কারণে দেশটির জনসংখ্যায় এ হারে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
আরো বলা হচ্ছে, কঠোর নিয়মের কারণে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাংকগুলো আগের মতো ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। ফলে দেশটির আবাসন বাজারে বিকল্প ঋণদাতাদের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান প্রুডেনশিয়াল রেগুলেশন অথরিটি (এপিআরএ) ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনা করে ব্যাংক থেকে ঋণ বাবদ অতিরিক্ত ৩ শতাংশ সুদভিত্তিক নিরাপত্তা সীমা আরোপ করেছে, যা অনেক ঋণগ্রহীতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে প্রাইভেট খাতের ঋণদাতার।
গ্রিনস্টেইন বলেন, ‘আবাসনের ঘাটতি মানে শুধু বাড়িই নয়, স্কুল, শপিং সেন্টার এবং বাণিজ্যিক স্থাপনাও ঘাটতিতে পড়ছে। ফলে এ বাজারে বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।’
প্রধানত সিডনি ও মেলবোর্ন শহরে প্রকল্পে বিনিয়োগ করে জাগা। বিনিয়োগকারীরা সরাসরি ঋণ বা কোম্পানির ফান্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে পারেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিনিয়োগকারীদের চাহিদা বিবেচনায় রেখে সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে একটি প্রাইভেট ক্রেডিট ফান্ড চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যা অস্ট্রেলিয়ার মূল তহবিলের সঙ্গে সংযুক্ত।
চলতি বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া সরকার বিদেশীদের পুরনো আবাসিক সম্পত্তি কেনার ওপর দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে নতুন নির্মাণ প্রকল্পে বিনিয়োগে তেমন বাধা নেই।
প্রপার্টি প্লাটফর্ম ডোমেইনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরের মধ্যে সিডনির বাড়ির দাম ৭ শতাংশ এবং অ্যাপার্টমেন্টের দাম ৬ শতাংশ বাড়বে। সিডনিতে বাড়ির গড় মূল্য দাঁড়াবে রেকর্ড ১৮ লাখ ৩০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার এবং অ্যাপার্টমেন্টের দাম হবে ৮ লাখ ৮৯ হাজার ডলার।
পাবলিক রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্টের (আরইআইটিএস) তুলনায় জাগার ঋণ তহবিল তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান তহবিল রিটার্নের হার নির্ধারণ করেছে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহারের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি। বর্তমানে এ হার ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তহবিলে মাসিক আয় বিতরণের সুবিধাও রয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আলভারেজ অ্যান্ড মার্সাল জানিয়েছে, ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় প্রাইভেট খাতের ঋণ বাজারের আকার ছিল ২০ হাজার ৫০০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার, যার মধ্যে ৮ হাজার ৫০০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার ছিল রিয়েল এস্টেট-সংক্রান্ত ঋণ। সিডনিভিত্তিক প্রিভিটি ক্রেডিট পূর্বাভাস দিয়েছে, আগামী তিন-চার বছরে এ বাজার দেড় গুণ বাড়বে।